বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন
বাংলাদেশে হিন্দুদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার চলে হিন্দু আইনের দায়ভাগ মতবাদ অনুযায়ী। এর মূল নীতি “আধ্যাত্মিক কল্যাণ” (পিণ্ডদানের অধিকার), তাই কাছের আত্মীয় আগে পান এবং আগের ক্রমের কেউ থাকলে পরের ক্রম বাদ পড়ে। মুসলিম ফারায়েজের মতো এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ লিখিত কোড নেই। এর সঙ্গে ১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন বিধবাদের অংশ নির্ধারণ করে।
এই ক্যালকুলেটর মৃত হিন্দু পুরুষ, উইল ছাড়া মৃত্যু এবং তাঁর নিজস্ব বা পৃথক সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রম অনুযায়ী অংশ বের করে।
দায়ভাগে উত্তরাধিকারীদের ক্রম
নিচে প্রথম ২০টি ক্রম দেওয়া হলো, যেগুলো এই টুলে নির্বাচন করা যায়। এর পরেও মাতৃকুলের আরও দূরবর্তী সপিণ্ডের ক্রম আছে (মোট ৫৩ শ্রেণি), যা এই টুলে ধরা হয়নি।
| ক্রম | উত্তরাধিকারী | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ১ | পুত্র | প্রথম তিন ক্রম পার-স্টার্পিসে (শাখা অনুযায়ী) একসাথে চলে |
| ২ | পুত্রের পুত্র (পৌত্র) | পিতা মারা গেলে ওই পুত্রের অংশ পান |
| ৩ | পুত্রের পুত্রের পুত্র (প্রপৌত্র) | পৌত্র না থাকলে |
| ৪ | বিধবা স্ত্রী; মৃত পুত্রের বিধবা | বিধবা এক পুত্রের সমান অংশ পান, জীবনস্বত্বে |
| ৫ | কন্যা | ১–৪ নম্বর কেউ না থাকলে। অবিবাহিতা অগ্রগণ্য, তারপর পুত্রবতী কন্যা |
| ৬ | কন্যার পুত্র | মাথাপিছু সমান |
| ৭ | পিতা | |
| ৮ | মাতা | জীবনস্বত্বে |
| ৯ | ভাই | সহোদর, না থাকলে বৈমাত্রেয় |
| ১০ | ভাইয়ের পুত্র | সহোদর, না থাকলে বৈমাত্রেয় |
| ১১ | ভাইয়ের পৌত্র | সহোদর, না থাকলে বৈমাত্রেয় |
| ১২ | বোনের পুত্র | |
| ১৩ | পিতার পিতা (পিতামহ) | |
| ১৪ | পিতার মাতা (পিতামহী) | জীবনস্বত্বে |
| ১৫ | পিতার ভাই (পিতৃব্য) | |
| ১৬ | পিতার ভাইয়ের পুত্র | |
| ১৭ | পিতার ভাইয়ের পৌত্র | |
| ১৮ | পিতার বোনের পুত্র | |
| ১৯ | পিতার পিতার পিতা | |
| ২০ | পিতার পিতার মাতা | জীবনস্বত্বে |
কীভাবে অংশ ভাগ হয়
- পার-স্টার্পিস (শাখা অনুযায়ী): পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্রের ক্ষেত্রে। প্রতিটি পুত্রের একটি শাখা, আর মৃত পুত্রের শাখা তাঁর বংশধরদের মধ্যে ভাগ হয়।
- মাথাপিছু সমান: কন্যার পুত্র, ভাইয়ের পুত্র, পিতৃব্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে একই ক্রমে যতজন থাকেন, সবাই সমান অংশ পান।
- আগের ক্রম পরেরটিকে বাদ দেয়: যেমন পুত্র থাকলে পৌত্র (একই শাখায়), পিতা-মাতা, ভাই-বোন কেউ অংশ পান না।
উদাহরণ ১: দুই পুত্র ও এক বিধবা স্ত্রী
বিধবা এক পুত্রের সমান অংশ পান। তাই ৩ ভাগ, প্রত্যেকে ১/৩। বিধবার ১/৩ অংশ জীবনস্বত্বে। ৩০ শতাংশ জমি থাকলে প্রত্যেকে ১০ শতাংশ।
উদাহরণ ২: দুই জীবিত পুত্র এবং এক মৃত পুত্রের দুই পুত্র
তিন শাখা, প্রতি শাখা ১/৩। জীবিত দুই পুত্র ১/৩ করে। মৃত পুত্রের শাখার ১/৩ তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়, তাই প্রত্যেকে ১/৬। যোগফল ১/৩ + ১/৩ + ১/৬ + ১/৬ = ১।
উদাহরণ ৩: দুই অবিবাহিতা কন্যা ও এক পুত্রবতী কন্যা (পুত্র-বংশধর ও বিধবা নেই)
অবিবাহিতা কন্যা অগ্রগণ্য, তাই তাঁরা দুজন ১/২ করে পান (জীবনস্বত্বে)। পুত্রবতী কন্যা এ ক্ষেত্রে অংশ পান না।
বিধবার অংশ ও ১৯৩৭ সালের আইন
পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্র থাকলেও এই আইনের ফলে বিধবা এক পুত্রের সমান অংশ পান। আগে মারা যাওয়া পুত্রের বিধবা (পুত্রবধূ) তাঁর স্বামীর অংশ পান, যদি ওই পুত্রের জীবিত পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্র না থাকে। বিধবার পুনর্বিবাহে সাধারণত স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থাকে না। ২০২১ সালে হাইকোর্টের একটি রায়ের সংবাদ অনুযায়ী বিধবা শুধু বসতভিটা নয়, কৃষিজমিসহ স্বামীর সব সম্পত্তিতেই এই আইনের অংশ পান।
কন্যার অবস্থান
দায়ভাগের প্রচলিত বিধানে কন্যা তখনই উত্তরাধিকারী হন যখন পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র ও বিধবা কেউ নেই। তখনও সব কন্যা সমান নন: অবিবাহিতা অগ্রগণ্য, তারপর পুত্রবতী বা পুত্রসম্ভবা কন্যা। বন্ধ্যা ও পুত্রহীনা বিধবা কন্যা উত্তরাধিকারী নন। যাঁরা অংশ পান না, তাঁদের ভরণপোষণের দাবি থাকতে পারে। এই বিধান নিয়ে হাইকোর্টে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে (সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের আলোকে রুল জারি হয়েছে) এবং আইন সংস্কারের দাবি আছে। আমাদের জানামতে সংসদ এখনও পূর্ণাঙ্গ নতুন আইন করেনি। আইন বদলালে ফলাফলও বদলাবে।
জীবনস্বত্ব (নারী উত্তরাধিকারীর সীমিত অধিকার)
বিধবা, কন্যা, মাতা ও পিতামহীর মতো নারী উত্তরাধিকারী সাধারণত সম্পত্তি ভোগের অধিকার পান। বিক্রি বা হস্তান্তরের অধিকার সীমিত, শুধু শ্রাদ্ধ, ঋণ পরিশোধ বা সম্পত্তি রক্ষার মতো প্রয়োজনে সম্ভব। তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তি পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের কাছে যায়। এটি নারীর স্ত্রীধন সম্পত্তি থেকে আলাদা, যেখানে তাঁর পূর্ণ মালিকানা থাকে।
অযোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতা
- মৃত ব্যক্তির হত্যাকারী ও তার ওয়ারিশ উত্তরাধিকার পান না।
- সন্ন্যাস গ্রহণ করলে ও বিধবা পুনর্বিবাহ করলে প্রথাগত বিধানে অধিকার হারান।
- ধর্মান্তরসহ আরও কিছু প্রথাগত বঞ্চনার বিধান আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তে ভিন্নভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।
- দত্তক পুত্র, স্ত্রীধন, বিশেষ প্রথা (custom) এবং আদালতের নির্দিষ্ট রায় এই টুলে ধরা হয়নি।
- শাখার ভেতরে একটি স্তরের বেশি জটিলতা (যেমন আগে মৃত পৌত্রের বিধবা) টুল হিসাব করে না।
জমি, স্বর্ণ ও রুপার একক
১ একর = ১০০ শতাংশ। স্বর্ণ ও রুপা ভরিতে ধরা হয়, ১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম। জমির মাপ বদলাতে জমির পরিমাপ কনভার্টার দেখুন।
উত্তরাধিকার সনদ ও আদালত
এই টুল আইনি সনদ দেয় না। অংশ নিয়ে সবাই একমত হলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ওয়ারিশান সনদ নেওয়া যায় এবং নামজারি (মিউটেশন) করা যায়। বিরোধ থাকলে আদালতে বণ্টন (পার্টিশন) মামলা করতে হয়। উত্তরাধিকার আইনি জটিল বিষয়, তাই এই ফল প্রাথমিক ধারণা হিসেবে নিন এবং আইনজীবীর পরামর্শ নিন।