রক্তে শর্করা (ব্লাড সুগার) কী
আমরা যা খাই তার শর্করা ভেঙে গ্লুকোজ হয়ে রক্তে মেশে, আর সেটিই শরীরের কোষের প্রধান জ্বালানি। রক্তে এই গ্লুকোজের পরিমাণকে রক্তে শর্করা বা ব্লাড সুগার বলে। ইনসুলিন হরমোন গ্লুকোজকে কোষে ঢুকতে সাহায্য করে। ইনসুলিন কম তৈরি হলে বা ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করা বেড়ে যায়, আর এই অবস্থার দীর্ঘস্থায়ী রূপই ডায়াবেটিস।
ব্লাড সুগার খুব কমে গেলেও বিপদ হতে পারে। তাই মান কোন সীমায় আছে, তা জানা দরকার। এই টুল আপনার দেওয়া মানকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত মানদণ্ড (ADA ও WHO) অনুযায়ী রঙিন স্কেলে দেখায়: নীল কম, সবুজ স্বাভাবিক বা লক্ষ্যসীমা, কমলা সতর্কতার সীমা এবং লাল অনেক বেশি।
কোন পরীক্ষা কখন করবেন
- খালি পেটে (ফাস্টিং): কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা কিছু না খেয়ে, সাধারণত সকালে। পানি পান করা যায়।
- খাবারের ২ ঘণ্টা পর: খাবার শুরুর ২ ঘণ্টা পরের মান, খাবারে শর্করা কেমন বাড়াচ্ছে তা বোঝায়।
- OGTT: ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ পান করার ২ ঘণ্টা পরের মান, ডাক্তারের নির্দেশে ল্যাবে করা হয়।
- র্যান্ডম: দিনের যেকোনো সময়ে, খাওয়ার সময় না দেখে।
- HbA1c: গত ২–৩ মাসের গড়, খালি পেটে থাকতে হয় না।
স্বাভাবিক মানের সারণি (ডায়াবেটিস নেই এমন প্রাপ্তবয়স্ক)
| পরীক্ষা | স্বাভাবিক | প্রি-ডায়াবেটিস সীমা | ডায়াবেটিস সীমা |
|---|---|---|---|
| খালি পেটে | ৫.৬-এর নিচে (১০০-এর নিচে) | ৫.৬–৬.৯ (১০০–১২৫) | ৭.০ বা বেশি (১২৬ বা বেশি) |
| OGTT, ২ ঘণ্টা পর | ৭.৮-এর নিচে (১৪০-এর নিচে) | ৭.৮–১১.০ (১৪০–১৯৯) | ১১.১ বা বেশি (২০০ বা বেশি) |
| HbA1c | ৫.৭%-এর নিচে | ৫.৭–৬.৪% | ৬.৫% বা বেশি |
গ্লুকোজের মান mmol/L-এ, বন্ধনীতে mg/dL। WHO খালি পেটে প্রি-ডায়াবেটিস ধরে ৬.১ mmol/L (১১০ mg/dL) থেকে, ADA ধরে ৫.৬ (১০০) থেকে। তাই ৫.৬–৬.০ mmol/L মানটি দুই মানদণ্ডে আলাদাভাবে দেখা হয়।
ডায়াবেটিস থাকলে সাধারণ লক্ষ্য
| পরিমাপ | সাধারণ লক্ষ্য |
|---|---|
| খালি পেটে বা খাবারের আগে | ৪.৪–৭.২ mmol/L (৮০–১৩০ mg/dL) |
| খাবারের ১–২ ঘণ্টা পর (সর্বোচ্চ) | ১০.০ mmol/L-এর নিচে (১৮০ mg/dL-এর নিচে) |
| HbA1c | অনেকের জন্য ৭%-এর নিচে |
এগুলো গর্ভবতী নন এমন বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের সাধারণ লক্ষ্য। বয়স, অন্য রোগ ও হাইপোর ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে ডাক্তার আপনার জন্য ভিন্ন লক্ষ্য ঠিক করতে পারেন, তাই তাঁর দেওয়া লক্ষ্যই সঠিক।
mmol/L ও mg/dL রূপান্তর
১ mmol/L = প্রায় ১৮ mg/dL। বাংলাদেশের অনেক ল্যাব mmol/L ও অনেক গ্লুকোমিটার mg/dL ব্যবহার করে। বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি সমান মান:
| mmol/L | mg/dL (প্রায়) |
|---|---|
| ৩.৯ | ৭০ |
| ৫.৬ | ১০০ |
| ৭.০ | ১২৬ |
| ৭.৮ | ১৪০ |
| ১০.০ | ১৮০ |
| ১১.১ | ২০০ |
HbA1c থেকে গড় রক্তে শর্করা
HbA1c-এর মান থেকে আনুমানিক গড় গ্লুকোজ (eAG) বের করা যায়: eAG (mg/dL) = ২৮.৭ × HbA1c − ৪৬.৭, আর mmol/L পেতে ১৮ দিয়ে ভাগ করুন। যেমন HbA1c ৭% হলে ২৮.৭ × ৭ − ৪৬.৭ = ১৫৪ mg/dL, অর্থাৎ প্রায় ৮.৬ mmol/L। এটি গড়ের আনুমানিক হিসাব, দৈনিক মান এর চেয়ে ওপর-নিচে হয়।
| HbA1c | গড় গ্লুকোজ (mg/dL) | গড় গ্লুকোজ (mmol/L) |
|---|---|---|
| ৫% | ৯৭ | ৫.৪ |
| ৬% | ১২৫ | ৭.০ |
| ৬.৫% | ১৪০ | ৭.৮ |
| ৭% | ১৫৪ | ৮.৬ |
| ৮% | ১৮৩ | ১০.২ |
| ৯% | ২১২ | ১১.৮ |
| ১০% | ২৪০ | ১৩.৪ |
| ১১% | ২৬৯ | ১৪.৯ |
| ১২% | ২৯৮ | ১৬.৫ |
রক্তে শর্করা কম হলে করণীয়
৩.৯ mmol/L (৭০ mg/dL)-এর নিচে হলে এবং কাঁপুনি, ঘাম, মাথা ঘোরা, ক্ষুধা বা বুক ধড়ফড় লাগলে সাধারণত “১৫-১৫ নিয়ম” অনুসরণ করা হয়: প্রায় ১৫ গ্রাম দ্রুত শর্করা (গ্লুকোজ ট্যাবলেট বা পানিতে চিনির শরবত) খান, ১৫ মিনিট পর আবার মাপুন, তখনও কম থাকলে আবার খান। মান ঠিক হলে হালকা খাবার খান। রোগী অজ্ঞান হলে মুখে কিছু দেবেন না, দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
- খুব বেশি তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব, বিশেষ করে রাতে।
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া বা সবসময় ক্লান্তি।
- ঝাপসা দেখা, ক্ষত শুকাতে দেরি বা বারবার সংক্রমণ।
- পরীক্ষায় একাধিকবার মান প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস সীমায় আসা।
- ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় থেকেও মান বারবার লক্ষ্যের বাইরে যাওয়া।
সঠিক মাপের জন্য কয়েকটি কথা
- খালি পেটের পরীক্ষার আগে ৮ ঘণ্টা কিছু খাবেন না, শুধু পানি খেতে পারেন।
- আঙুল পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন, মেয়াদোত্তীর্ণ স্ট্রিপ ব্যবহার করবেন না।
- নিয়মিত ওষুধ খেলে পরীক্ষার দিন ওষুধ খাবেন কি না, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নিন।
- গ্লুকোমিটার ও ল্যাবের মানে কিছুটা তফাত স্বাভাবিক।
রক্তে শর্করা ভালো রাখার সাধারণ উপায়
- ভাত, রুটি ও মিষ্টির পরিমাণ মেপে খান এবং শাকসবজি, ডাল, আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান।
- কোমল পানীয়, ফলের রস ও অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন।
- সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম, যেমন দ্রুত হাঁটা, করার চেষ্টা করুন।
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে কমান, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং ধূমপান এড়ান।
এই টুলের সীমাবদ্ধতা
এই টুল রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। মানদণ্ড গর্ভবতী নন এমন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য ভিন্ন। ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক করতে এই ফল ব্যবহার করবেন না। মান নিয়ে সন্দেহ থাকলে বা কোনো উপসর্গ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।